নির্ভীক ও দৃঢ়চেতা বিচারক কাজি শুরাইহ

নির্ভীক এক সাহাবির বিচার নিরপেক্ষতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যার বিচারের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হয়ে হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বিচারক হিসেবে

নিয়োগ দেন। তিনি দীর্ঘদিন এ বিচারকার্য সম্পাদন করেন। ইসলামের ইতিহাসে এক বিরল প্রতিভার অধিকারী ছিলেন বিচারপতি কাজী শুরাইহ রাদিয়াল্লাহু আনহু।

তাঁর বিচারিক কার্যক্রম ইসলামের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যার নির্ভীক বিচারিক রায় হজরত উমর ও হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুমার বিরুদ্ধে চলে যায়। বিচারের রায়ে সন্তুষ্ট হয়ে হরজত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুই তাঁকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের শাসনকাল পর্যন্ত বিচারকের পদে আসীন ছিলেন। কাজি শুরাইহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর বিচারের রায়-

১. হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর শাসন আমলে এক লোকের কাছ থেকে একটি ঘোড়া কেনেন। ঘোড়াটি কিনে তিনি তাতে সাওয়ার হন এবং কিছুদূর চলে যান। এরপর তিনি লক্ষ করেন ঘোড়াটি সাওয়ারি হিসেবে ত্রুটিযুক্ত। তিনি ঘোড়াটি নিয়ে বিক্রেতার কাছে এসে তা ফেরত দিতে চাইলেন। বিক্রেতা তা ফেরত নিতে রাজি না হওয়ায় উভয়ে একজন মধ্যস্থতাকারীর আশ্রয় নিলেন। বিক্রেতা শুরাইহকে বিচারক হিসেবে মানায় হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুও তাতে সায় দেন।

হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে ঘোড়া বিক্রেতা শুরাইহের আদালতে স্বয়ং খলিফার বিরুদ্ধে সাওয়ারীর ক্ষতি সম্পর্কে বিচার প্রার্থনা করে। কাজী শুরাইহ উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনে রায় দিলেন। ত্রুটিযুক্ত এ ঘোড়া ফেরত দেওয়া যাবে না। কেননা তিনি হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আপনি যখন এটি ক্রয় করেন তখন এটি ত্রুটিযুক্ত ছিল কিনা। ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু জানান, না, এটি সে সময় ত্রুটিযুক্ত ছিল না। তখন শুরাইহ বলেন, ঘোড়া ফেরত দিতে হলে ত্রুটিযুক্ত ঘোড়া ফেরত দিতে হবে। নতুবা এ ঘোড়া ফেরত দেওয়া যাবে না। এতে বিক্রেতার কোনো দোষ নেই।

রায় হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে চলে যায়। অর্ধ জাহানের খলিফার বিরুদ্ধে রায়! যার নাম শুনলে সিংহহৃদয় পুরুষদের অন্তরও কেঁপে উঠতো। কিন্তু ইনসাফ ও ন্যায়ের মূর্ত প্রতীক হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এ বিচারের রায় মেনে নিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেননি। বরং অম্লান বদনে রায় মেনে নিলেন।

নির্ভীক ও দৃঢ়চেতা এ বিচারের ফলে হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে কুফার বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি ৬১ মতান্তরে ৭৫ বছর পর্যন্ত কুফার বিচারপতি হিসেবে কাজ করেন।

২. হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং এক ইয়াহুদির মধ্যকার বিচার কার্যটিও সৎ ও সাহসী বিচারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একটি লৌহবর্ম নিয়ে এক ইহুদির সঙ্গে হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর বিবাদ ছিল। হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং ইহুদির মধ্যকার বিচারের ফয়সালায় বিচারক কাজী শুরাইহ বলেন, হে আমিরুল মুমিনিন! আপনি ঐ ইহুদির চেয়ে মর্যাদাবান এবং বিশ্বস্ত। কিন্তু ন্যায় বিচারের দৃষ্টিতে উভয়েই সমান। আপনি আপনার দাবির পক্ষে সাক্ষী হাজির করুন। হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর দাবির পক্ষে ছেলে হজরত হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু ও তার ক্রীতদাসকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত করেন। কাজী শুরাইহ তাঁকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, ‘পিতার পক্ষে পুত্রের সাক্ষ্য এবং মনিবের পক্ষে দাসের সাক্ষ্য গৃহীত হয় না। ফলে আপনার দাবি অগ্রাহ্য হলো।’ বিচারের ফয়সালা ইহুদিরে পক্ষে চলে যায়। ইহুদি কাজী শরাইহের বিচারিক কার্যক্রম দেখে ইসলাম গ্রহণ করেন।

যাদের অন্তরে আছে আল্লাহর ভয়, তারা জাগতিক কোনো মহাক্ষমতাধর ব্যক্তিকে ভয় করে না। হোক সে অর্ধ জাহানের মহান শাসক হজরত ওমর বা হোক কোনো রাষ্ট্র নায়ক। আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার সব বিচারকেরদের পাশাপাশি মুসলিম উম্মাহকে ন্যায় নীতির উপর অটল ও অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।